আমার হাইকোর্ট ভাইভা
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, তারিখে ১২তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশিত হয়। যে কারণে এমনিতেই মুষড়ে পড়েছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ করে হাইকোর্ট এনরোলমেন্ট পরীক্ষার ভাইভা নেওয়ার সময়সূচী প্রকাশিত হয়। অামার পরীক্ষার সময় নির্ধারিত হয় ৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে। জুডিসিয়ারি রেজাল্টের কারণে এমনিতেই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। এরই মধ্যে অাবার এমন পরীক্ষা এসে হাজির যেটাতে কৃতকার্য হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নাই অামার কাছে। যাই হোক, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। অার বার কাউন্সিলে খোঁজ নিলাম যে, অামাদের জজ কোর্টের অাইনজীবী হওয়ার সনদ, ভাইভা তে নেওয়া বাধ্যতামূলক কি না। বার কাউন্সিল থেকে অামাদের নিশ্চিত করলো যে, অামরা যারা ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে এনরোলড্ হয়েছি তাদের যেহেতু এখনো বার কাউন্সিল থেকে অফিসিয়ালি সনদ দেওয়া হয়নি, তাই ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে যারা অাইনজীবী হয়েছেন তাদের ভাইভা বোর্ডে অাইনজীবীর সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক না। উল্লেখ্য যে, অামাদের পরীক্ষার অাগে ফর্ম পূরণের সময়ও সনদ লাগে নাই; ২০১৪ এর অাগে পাশ করা সকলের সনদ লেগেছে। মার্চের ১ অথবা ৩ তারিখে ভাইভা শুরু হলো, তখনও ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে পাশ করা কারো সনদ লাগে নাই। এই কারণে অামি অার অাইনজীবীর সাময়িক সনদ উত্তোলন করিনি।
অাজ ৯ মার্চ, ২০১৯- শনিবার। সকালে উঠে গোসল করে, নামাজ-কুরঅান পড়ে, রেডি হয়ে হাইকোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সকাল ৮.৪৫ এর দিকে সুপ্রীম কোর্ট অডিটোরিয়াম এর সামনে উপস্থিত হলাম। নয়টা থেকে ভাইভা শুরু হওয়ার কথা কিন্তু এখনো গেট বন্ধ অর্থাৎ মাননীয় বিচারপতি মহোদয়গণ এবং বার কাউন্সিলের কেউ ই অাসে নাই। অামি খুব বেশি নার্ভাস না বরং অাত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে- যা ই জিজ্ঞেস করুক না কেন ইনশা-অাল্লাহ্ পারবো। ইতোমধ্যে, কয়েকজন ক্লাসমেট এবং ভার্সিটির বড় ভাইদের সাথে দেখা হলো। কথাবার্তা হলো। বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেছিলাম। বার কাউন্সিলের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির লোকজনও চলে অাসলো, সেই সাথে একটু পরে মাননীয় বিচারপতি মহোদয়গণও। ভাইভা শুরু হলো সকাল ১০টার দিকে। অামার রোল নাম্বার ছিল ১***, ওই দিন অামি ১০নং ভাইভা পরীক্ষার্থী ছিলাম। অামার রোল কল করা হলো, ভেতরে ঢুকে সিগনেচারশীটে সিগনেচার করে ভাইভা বোর্ডে ঢুকার জন্য অপেক্ষায় অাছি। দুইটা বোর্ড ছিল এবং এক বোর্ড থেকে অারেক বোর্ডের দূরুত্ব ১০ মিটারের মতো, মাঝে কোনো পর্দা বা দেয়াল নাই। খালি চোখে দেখা যায় অারকি। বোর্ড-১ এর সদস্য ছিলেন ৩জন যথাক্রমে- অাপিল বিভাগের বিচারপতি অাবুবকর সিদ্দিকী স্যার, হাইকোর্টের বিচারপতি ভবানীপ্রসাদ সিংহ স্যার এবং জনাব অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে অালম স্যার। এবং বোর্ড-২ এর সদস্যগণ হলেন যথাক্রমে- অাপিল বিভাগের বিচারপতি মোঃ নুরুজ্জামান স্যার (এনরোলমেন্ট কমিটির প্রধান), হাইকোর্টের বিচারপতি রাজিক অাল জলিল স্যার এবং বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়্যারমান সিনিয়র অ্যাডভোকেট জনাব ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন স্যার।
সালাম দিয়ে বোর্ড-২ তে ঢুকলাম। ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন স্যার জিজ্ঞেস করলেন, জেলা কোথায়? বললাম জেলার নাম। মাননীয় বিচারপতি মোঃ নুরুজ্জামান স্যার জিজ্ঞেস করলেন, সনদ কোথায় অাপনার? বললাম, স্যার অামাদের জন্য সনদ অানা বাধ্যতামূলক করা হয়নি এবং বার কাউন্সিলে খোঁজ নিয়েছিলাম, ওখান থেকে বলা হয়েছে যে যারা ২০১৪ এবং ২০১৬ তে অাইনজীবী হয়েছেন তাদের সাময়িক সনদ লাগবে না। নুরুজ্জামান স্যার, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহফুযুল মুরশেদ সাহেবকে ডেকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। মাহফুযুল সাহেবও বললেন, স্যার ২০১৪ এবং ২০১৬ তে যারা অ্যাডভোকেট হয়েছেন তাদের এখনো বার কাউন্সিল অানুষ্ঠানিকভাবে সনদ প্রদান করে নাই বলে উনাদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য না। (উল্লেখ্য যে, ১- ৮ মার্চ পর্যন্ত এই নিয়মেই পরীক্ষা হয়েছে এবং এখনো বোর্ড-১ এ এভাবেই পরীক্ষা নিচ্ছে।) নুরুজ্জামান স্যার বললেন, না না সনদ ছাড়া কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না। অামাকে বললেন, ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নাই; অাবেদন করে যান এবং পরে সনদ নিয়ে অাসলে পরীক্ষা নেওয়া হবে!!!!! অামি তো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নাই মানে!!!! উনি বলেন কী???? যাই হোক, তর্ক করলে দেখা যাবে ওখানেই ফেল করায় দিলো। তাই কথা না বলে, অাবেদনপত্র লিখে, জমা দিয়ে বাইরে বের হয়ে অাসলাম। ভাবতে লাগলাম অাব্বাকে কী জবাব দিব!!!! জীবনে এতোটা অসহায় অার কোনোদিন হইনি। অারো অবাক হলাম যখন শুনলাম বোর্ড-১ এ সনদ ছাড়াই পরীক্ষা নিচ্ছে!!!! এক দেশে দুই নীতি অারকি!!! অথচ উনারাই অাবার নিজেদের জাস্টিস অব দ্যা পিচ বলে দাবি করেন!!! এই হলো উনাদের অাইনের প্রতি শ্রদ্ধা!!!! এই হলো অাইনের শাসন!!! ওইদিন অামার মতো ১০-১২ জনের এমন অবস্থা হয়েছিল, যাদের সনদের কারণে পরীক্ষা নেওয়া হয় নাই। অারো মজার ব্যাপার হলো, ভার্সিটির এক ছোট ভাই অামার পরিণতির কথা শুনে বার কাউন্সিলের এক স্টাফ কে কয়েকশ টাকা ঘুষ দিয়ে বোর্ড-১ এ পরীক্ষা দিয়েছে; অথচ তার পরীক্ষা ছিল বোর্ড-২ তে। পরীক্ষা দিতে পারিনি এটা নিয়ে অামার কোনো অাফসোস থাকতো না, যদি না দুই বোর্ডে দুই রকম নিয়ম না হতো!!! অার তাছাড়া এতদিন এই নিয়ম ছাড়াই পরীক্ষা নিয়েছে।
পরেরদিন রবিবার খুব সকালে বার কাউন্সিলে গিয়ে ২০০০ টাকা জমা দিয়ে সাময়িক সনদ উত্তোলনের জন্য অাবেদন করলাম। কিন্তু ওখান থেকে বলা হলো, সনদ প্রস্তুত করতে ৪-৫ দিন সময় লাগবে। কিন্তু এতদিন তো অামি দেরি করতে পারবো না, অামার তো খুব দ্রুত সনদ লাগবে। তিনজন একিতত্র হয়ে, বার কাউন্সিলের এক পিয়নের সাথে কথা বললাম যার নাম ছিল রাব্বী। সে বলল, ১৫০০ টাকা করে দিলে অাজকে বিকেলের মধ্য সনদ পাবেন। কী অার করা, অামরা তো জিম্মি!!!! রাব্বীকে তিনজনে মিলে ৪৫০০ টাকা দিলাম। এই বদমাইশ কে কোনোদিন অামি ভুলতে পারবো না। জীবন প্রথমবার অামি কোথাও ঘুষ দিলাম। নিজেকেই যেন ক্ষমা করতে পারছিলাম না। রাব্বীর চেহারা দেখে বিখ্যাত অপরাধ বিজ্ঞানী লমব্রসোর থিওরির কথা মনে পড়ে গেল। অপরাধ বিজ্ঞান পড়ার সময় জেনেছিলাম যে, লমব্রসো অপরাধীদের বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্টের কথা বলেছিলেন, যেমন- বড় কাঁধ, অস্বাভাবিক অাকৃতির কান, বিশেষ ধরণের কপাল ইত্যাদি। তখন এই থিওরিকে ভুয়া মনে করতাম। ভাবতাম চেহারার সাথে অপরাধের অাবার কী সম্পর্ক!!!! কিন্তু রাব্বীকে দেখে জীবনে প্রথমবারের মতো লমব্রসোর থিওরির সাথে একমত হলাম। রাব্বীকে দেখে মনে হলো এর চেহারায় লমব্রসোর থিওরির সকল গুণাগুণ বিদ্যমান!!! এর জন্মই হয়েছে মনে হয় মানুষকে হয়রানি করার জন্য। সনদ পাওয়ার অাগে অারেক পিয়নকে অারো ১০০ টাকা দিতে হলো। সনদ হাতে পেলাম বিকাল ৪টার দিকে। তাড়াতাড়ি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর দরখাস্ত লিখে বোরাক টাওয়ার বরাবর দৌড় দিলাম। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের রুমে ঢুকে দেখি উনি নাই, ভাইভা পরীক্ষার ওখানে অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্টে গিয়েছেন। উনার রুমে জুনিয়র এক অফিসার ফোনে কোনো নারীর সাথে খোশ গল্প করছিলেন অামাদের সামনেই। অামরা দাঁড়িয়ে অাছি, কিন্তু উনি বিন্দুমাত্র বিব্রত না হয়ে উক্ত নারীর সাথে কথা চালিয়ে গেলেন। অবশেষে অামরা দাঁড়িয়ে অাছি দেখে ফোন রেখে অামাদের জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বলুন। অামরা সবকিছু খুলে বলে, উনাকে দরখাস্তখানা রাখতে বললাম। উনি সবকিছু শুনে বললেন, দেখেন দরখাস্ত স্যারের কাছে দিলেই ভাল হয়; দেখা গেল অামার কাছৈ অাপনারা দরখাস্ত দিয়ে গেলেন কিন্তু অামি যদি স্যার বরাবর দরখাস্ত দেওয়ার অাগে এটা হারিয়ে ফেলি তখন কী হবে!!!!! অারো বললেন, এবার তো হাইকোর্ট ভাইভা অনেক সহজ হচ্ছে, অামি আইনের ছাত্র না হয়েই সব প্রশ্নের উত্তর জানি। কিন্তু অাপনারা অ্যাডভোকেটরা যে কেন পারছেন না, বুঝতে পারছি না। অনেকে তো এলএল.বি এর অর্থ ব্যাচেলর অব লজ এটাই বলতে পারতেছে না। দেখুন অাপনারা একটু ভালভাবে প্রিপারেশন নিয়েন। এই হারামজাদার কথা শুনে রাগে অামার গা কাঁপতেছে; কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম এলএল.বি এর মিনিং শুধু ব্যাচেলর অব লজ না বরং Legum Baccalaureusও বটে। এরপরে বদমাইশটা বলতেছে ঠিক অাছে, অাপনারা দরখাস্ত রেখে যান, অামি স্যার অাসলে স্যারের কাছে দরখাস্তটা দিব। কিন্তু অাপনারা অাগামীকাল সকালে এসে স্যারের সাথে অাবার দেখা করে গেলে ভাল হয়।
পরেরদিন সকাল ১০টার দিকে বার কাউন্সিলে গিয়ে সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহফুযুল মুরশেদ সাহেবের সাথে দেখা করলাম। অামাদের দেখা মাত্রই উনি এমনভাবে ‘কী চান’ বললেন, তাতে মনে হলো অামরা বোধহয় উনার কিডনি চাইতে এসেছি!!! যাই হোক, কিছু করার নাই; অামরা যেহেতু উনার কাছে ধরা তাই নিরবে সহ্য করে যেতে হবে। অামরা দরখাস্তের ব্যাপারে বললাম, অবশেষে উনি অামাদের দরখাস্ত টেনে বের করে দেখে বললেন- অাপনাদের পরীক্ষা সবার শেষে হবে অথবা কবে হবে বলতে পারছি না। অামরা জিজ্ঞেস করলাম, পরীক্ষার বিষয়ে অামরা জানবো কীভাবে??? অামাদের রোল কি বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে???? মুরশেদ সাহেব রাগান্বিত হয়ে উত্তর দিলেন, না কোথাও প্রকাশিত হবেন না; ফোন করে জানানো হতেও পারে অাবার নাও হতে পারে- অাপনাদের নিয়মিত বার কাউন্সিলে এসে খোঁজ খবর নিতে হবে। এখন অাপনারা অাসুন, দেখছেন না অনেক ব্যস্ত অাছি। মন খারাপ করে উনার রুম থেকে ফিরছিলাম এমন সময় সেদিন অামাদের সাথে পরীক্ষা দিতে পারে নাই এমন একজনের দেখা পেলাম। উনি বললেন, ভাই অামার পরীক্ষা তো অাগামী বৃহস্পতিবার নিবে। অামি বললাম, কই অামাদের তো এমন কিছু বললো না বরং দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দিল। উনি বললেন, ভাই অামি ওমুক জেলার বারের সেক্রেটারির জুনিয়র। অামাকে যেদিন পরীক্ষা নেওয়া হলো না সেদিনই অামি স্যারকে ফোন দিলে, স্যার তখনই বিমানে করে ঢাকা চলে অাসেন। এবং পরেরদিন জনৈক বিচারপতির সাথে দেখা করলে, বিচারপতি বার কাউন্সিলে ফোন দিয়ে দেন; তাই অামার পরীক্ষা বৃহস্পতিবারে নেওয়া হবে। এটা শুনে, সাকা চৌধুরীর মাননীয় স্পিকারের উদ্দেশ্যে দেওয়া বিখ্যাত মন্তব্যের কথা মনে পড়লো। তবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই ভেবে যে, অামার সাথে কেউ না থাকলেও অাল্লাহ্ তো অাছেন। নিশ্চয়ই অাল্লাহ্ অামাকে রক্ষা করবেন। হয়তো অাল্লাহ্ অামার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। বাসায় চলে অাসলাম। কাউকে কিছু বলতেও পারিনা; শুধু নিরবে নিভৃতে চোখের জল ফেলে পরমকরুণাময় অাল্লাহ্ এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।
দুদিন পরে বার কাউন্সিলে গিয়ে অাবার মাহফুযুল মুরশেদ সাহেবের সাথে দেখা করলাম। এবার তিনি একটু সদয় হলেন বলে মনে হলো। অামাকে দেখে উনিই প্রথম জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার বলেন তো অাপনাকে তো রেগুলার ই বার কাউন্সিলে দেখতেছি। অামি বললাম, কী করবো বলেন- অামার তো অার কোনো উপায় নেই। উনি বললেন, কবে পরীক্ষা দিতে চান বলেন। অামি উত্তরে বললাম, অাপনারা যেদিন নিতে চান সেদিনই অামি দিতে রাজি। অতঃপর উনি বললেন, ঠিক অাছে পরীক্ষা শেষ হবে ওমুক তারিখে; অাপনি তার অাগের দিন পরীক্ষা দেন- এটা বলে অামার দরখাস্ত কী যেন লিখলেন। এবং বললেন, ঐদিন চলে অাসবেন পরীক্ষা দিতে। বিগত কয়েকদিনে অসহ্য যস্ত্রণার পরে যেন একটু শান্তির পরশ পেলাম।
দুদিন পরে এক বন্ধু ফোন দিয়ে বলল, ভাই- বার কাউন্সিল থেকে ফোন দিয়ে বলেছে যে অামরা যারা সনদের কারণে পরীক্ষা দিতে পারিনি তাঁদের সকলের পরীক্ষা শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হবে। সে অারো বলল যে, এই বিষয়ে অন্যান্য সকলকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে বলা হয়েছে। অামি কয়েকজন কে ফোন দিলাম, সবাই বলল তাঁদের কে বার-কাউন্সিল থেকে ফোন দেওয়া হয়েছে। শুধু অামাকেই কোনো ফোন দেওয়া হয় নাই। এ যেন শেষ হইয়াও, শেষ না হওয়ার মত যন্ত্রণা। যাই হোক, টেনশন বাদ দিয়ে ঠিক করলাম শেষ দিনই যাব। যা হওয়ার হবে। এই জ্বালা অার ভাল লাগছে না।

অবশেষে অাসলো সেই দিন। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে, সালাত অাদায় করে, কুরঅান পড়ে, গোসল করার পরে পোশাকাদি পরে সুপ্রিমকোর্টের দিকে রওনা দিলাম। সেদিন ছিল ভাইভা পরীক্ষার শেষ দিন। সকল জুডিশিয়াল অফিসারদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছিল ঐদিনে। সেই সাথে অামাদের মতো যারা বিভিন্ন কারণে পরীক্ষা দিতে পারে নাই তাদেরও। যাই হোক, সুপ্রীম কোর্ট অডিটোরিয়ামে পৌছানো মাত্রই বার কাউন্সিলের এক পিয়নের কাছ থেকে নিশ্চিত হলাম যে, অাজকে অামাদের পরীক্ষা অাদৌ নেওয়া হবে কিনা। যখর হাজিরা শীটে অামার রোল নাম্বার দেখলাম তখন অামি যেন অানন্দে অাত্মহারা। শুধুমাত্র পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়েও যে মানুষ অানন্দ পেতে পারে- সেটা জীবনে প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করলাম। সকাল ৯ টা থেকে অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে বিকাল ৪.৩০ এর দিকে অামার রোল কল করা হলো। অাল্লাহ্ এর নাম নিয়ে ভাইভা বোর্ডে ঢুকেই সালাম দিলাম। লক্ষ করলাম যারা অামার ভাইভা নেয় নাই, ঠিক সেই তিনজনের সামনেই অামি অাবার এসে হাজির হয়েছি। অর্থাৎ বোর্ড মেম্বার ছিলেন- অাপিল বিভাগের বিচারপতি মোঃ নুরুজ্জামান স্যার (মাঝখানে বসা ছিলেন), হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জনাব রাজিক অাল জলিল স্যার (বামে ছিলেন), বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়্যারমান বিজ্ঞ অাইনজীবী জনাব ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন স্যার (ডানে ছিলেন)।
(উল্লেখ্য যে, অামাকে শুধু ইউসুফ হোসেন স্যারই প্রশ্ন করেছিলেন।)
: অাসসালামু ওয়ালাইকুম।
: বসুন।
: ধন্যবাদ, স্যার।
: কোন বার?
: ওমুক বার, স্যার।
: ওখান থেকে এখানে (ঢাকায়) প্র্যাকটিস করতে অাসবেন তো?
: জ্বি অবশ্যই, স্যার। অামি অামার বাবার সাথে প্র্যাকটিস করি, উনি চান না অামি লোকাল বারে স্থায়ী হই। উনি চান অামি যেন হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করি।
: ২০১৪ সালে এনরোলড?
: জ্বি স্যার।
: কোন সাইডে প্র্যাকটিস করেন?
: সিভিল এবং ক্রিমিনাল দুই দিকেই তবে ক্রিমিনাল একটু বেশি।
: সর্বশেষ কোন মামলার হেয়ারিং করছেন?
: স্যার, অামি সাধারণত বাবাকে সাহায্য করি।
: নিজে কোনো হেয়ারিং করেনন নাই? হোক সেটা টাইম পিটিশন অথবা বেল হেয়ারিং বা অন্য কিছু?
: স্যার, সর্বশেষ যৌতুকের মামলার জামিন শুনানি করেছি।
: কোন পক্ষে বাদী নাকি বিবাদী?
: বিবাদী পক্ষে, স্যার।
: কী হেয়ারিং করেছিলেন বলেন শুনি।
: স্যার, অাপোষের শর্তে জামিন অাবেদন করেছিলাম। বিজ্ঞ অাদালত ধার্য তারিখ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছিলেন।
: এটা কি জামিনযযোগ্য নাকি জামিনঅযোগ্য?
: জামিনঅযোগ্য, স্যার।
: সাজা কত?
: অনূর্ধ্ব ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা অন্যূন ১ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
: ( বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান- এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন স্যার এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান অাপিল বিভাগের বিচারপতি জনাব মোঃ নুরুজ্জামান স্যার কে বললেন, ইয়ং ম্যান দিয়ে দেন। তখন বিচারপতি মোঃ নুরুজ্জামান স্যার অামাকে বললেন, ঠিক অাছে অাসেন।)
: ধন্যবাদ, স্যার। এটা বলে চলে অাসলাম।
অবশেষে ১৫ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশিত হলো। এবং পরম করুণাময় অাল্লাহ্ অামাকে সুপ্রীম কোর্টের একজন অাইনজীবী হিসেবে কবুল করলেন। অালহামদুলিল্লাহ্ ; অাল্লাহু অাকবার। বহু দিনের অধরা স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপান্তরিত হলো অাল্লাহ্’র দয়ায়। মাঝে মাঝে সত্যিই সন্দেহ হয় যে, অামি এত কিছুর যোগ্য কি না!!!
<p class="has-drop-cap has-normal-font-size" value="<amp-fit-text layout="fixed-height" min-font-size="6" max-font-size="72" height="80"><amp-fit-text layout="fixed-height" min-font-size="6" max-font-size="72" height="80">