আমার একুশে ফেব্রুয়ারি…

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রকৃত তাৎপর্য যখন থেকে বুঝতে শিখি নি তখন থেকেইে একুশে ফেব্রুয়ারি অামার কাছে বিশেষ দিন বলে মনে হতো। নব্বই দশকের শুরুতে জন্ম হওয়ার দরুণ তখনও একুশে ফেব্রুয়ারি অান্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পায় নি কিন্তু তবুও এই দিনটি বিশেষ মর্যাদা সহকারেই অামরা পালন করতাম। খুব ছোট বেলায় একুশে ফেব্রুয়ারির অাগের রাতে শহীদ মিনার বানানোর জন্য উঠে পড়ে লাগতাম। কখনো ইট দিয়ে, কখনো কাদা মাটি দিয়ে, কখনো বা বাঁশের চটা-কাগজ দিয়ে শহীদ মিনার বানানো হত। সেই সাথে চলতো লাউড স্পিকারে দেশাত্মবোধক গান অবিরাম। শহীদ মিনারের চারপাশে দড়ি দিয়ে বাউন্ডারি দিয়ে দড়িতে লাল-নীল-সবুজ-বেগুনী কাগজ লাগানো হতো যাতে শ্রী বৃদ্ধি পায়। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে শহীদ মিনারে ফুল দিতাম। অার পাড়ার অন্যান্য শহীদ মিনারের দিকে লক্ষ রাখতাম এটা দেখতে যে, কার শহীদ মিনারে বেশি ফুল জমা হলো। এ যেন অন্যরকম এক খুশির প্রতিযোগিতা। সেই সাথে চলতো পিকনিকের মাধ্যমে বিশেষ খাবারের আয়োজন।

পাহাড়ের উপর অবস্থিত সাস্টের শহীদ মিনারের সামনে বন্ধুদের সাথে…

“মনে অাছে, ছোটো বেলায় একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের অন্যতম অায়োজন ছিল লটারির ব্যবস্থা করা। দশ টাকার লটারি ফটোকপি করে একেকটা ২টাকা করে বিক্রি করতাম। দেখা গেল, ৭৫ টা লটারি বিক্রি হলো কিন্তু যে টাকা হলো তা দিয়ে সবগুলো পুরষ্কার দেওয়া যাচ্ছে না; তখন অামি নিজে ৫০-৬০ টাকা যোগ করে পুরষ্কার কিনে লটারির ড্র অনুষ্ঠান করতাম। ত্যাগের মাধ্যমেও যে অানন্দ পাওয়া যায় তা তখন থেকে বুঝতে শুরু করলাম। পুরষ্কার পাচ্ছে অন্যজন অথচ খুশি লাগছে আমার- এ আনন্দের যেন কোনো সীমা নেই!!!”

যতদূর মনে পড়ে সর্বশেষ শহীদ মিনার বানিয়েছি ২০০৫ সালে যখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। ২০০৬ সালে বানানো হয় নি কারণ কিছুদিন পরে এস.এস.সি পরীক্ষা ছিল; ২০০৭ সালেরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা সফরে কুয়াকাটা ছিলাম; ২০০৮ সালে হয় নি এইচ.এস.সি পরীক্ষা এবং বড় হয়ে যাওয়ার কারণে; ২০০৯ সালের পরে ঢাকা চলে আসার কারণে আর কখনোই শহীদ মিনার বানানো বা একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করা হয় নি। এই মুহূর্তে ২০১৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ছে যেদিন আমি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে অবস্থান করছিলাম। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সেদিন সত্যিই সেন্ট মার্টিনে এক উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।

বয়সে বড় হয়েছি, আশেপাশের সবকিছু পরিবর্তিত হয়েছে। সবকিছু ডিজিটাল হয়েছে বটে কিন্তু আগেরকার সেই অনাবিল আনন্দের বড়ই অভাব। তখন মোবাইল ছিল না, কম্পিউটার ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না- কিন্তু তবুও অনাবিল আনন্দের যেন কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এখন সবকিছু থেকেও কী যেন নেই, কী যেন হারিয়ে খুঁজি সর্বদা। তাই তো কবিগুরু বলেছেন-

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না–

  সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

          কান্নাহাসির বাঁধন তারা সইল না–

              সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি…

 ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

Published by Lawless Lawyer

a lawless lawyer...

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started